loader image

অর্থনৈতিক কূটনীতি ও গুরুত্ব বিশ্লেষণ

অর্থনৈতিক কূটনীতি ও গুরুত্ব বিশ্লেষণ

অর্থনৈতিক কূটনীতি:
অর্থনৈতিক কূটনীতি হলো এমন একটি পন্থা যার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো বহিবিশ্বে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ বৃদ্ধির কাজে নিজেকে সর্বদা নিয়োজিত রাখে। এটি অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে যেমন: ব্যবসা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আমদানি, রপ্তানি অন্যান্য সকল রকমের বিনিময়ের ক্ষেত্রে কাজ করে নিজের রাষ্ট্রের তুলনামূলক বেশি সুবিধা অর্জনের প্রতি দৃষ্টি রাখে। এককথায়, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি ইত্যাদিকেকেন্দ্র করে যে কূটনীতিক ব্যবস্থা পরিচালিত হয় তাই অর্থনৈতিক কূটনীতি।

বাংলাদেশের উন্নয়নে অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্ব।
এক সময় বাংলাদেশ ছিল বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। সে অবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে। বাংলাদেশে শিল্পায়নের বিস্তার ঘটছে দ্রুত। সারাদেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিল্পায়ন ছড়িয়ে যাচ্ছে। আর এসব কারণে অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নত রাষ্ট্র গঠনে। ২০২১ থেকে ২০৪১ অর্থাৎ ২০ বছর বাংলাদেশকে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার ৯ শতাংশ ধরে রাখার নতুন লক্ষ্য সরকারের। এই সময়ের মধ্যে বিনিয়োগের হার জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্বঅত্যধিক।

দক্ষ জনবল তৈরিতে: কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে
দক্ষ জনবল তৈরির গুরুত্ব রয়েছে। আর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি করে দেশের বাইরে পাঠানো যেতে পরে। যাতে করে প্রচুর পরিমাণ বিদেশি রেমিট্যান্স আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সীমিত সংখ্যক পণ্য ও বাজারের ওপর নির্ভর করে রপ্তানি সম্প্রসারণ কঠিন। রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য সরকার যেসকল সহায়তা দেয়, তার মধ্যে রয়েছে শুল্ক-কর-মূসক রেয়াত, নগদ প্রণোদনা ইত্যাদির সামগ্রিক কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনে সংস্থার ও সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া। এসবক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কূটনীতির দায় রয়েছে।

অর্থনীতির প্রসারে: দেশের বাইরে দক্ষ-অদক্ষ জনবল পাঠানো, বাইরে থেকে পর্যটক আকৃষ্ট করা, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য আমাদেরমেধাবীদের প্রেরণ, বিনিয়োগে আকর্ষণ ও বাণিজ্য প্রসার প্রভৃতি বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয় রয়েছে, রয়েছে নানা উদ্যোগও। আর এসব উদ্যোগ সহজে সমন্বয় করতে পারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাই সরকারের উচিৎ হবে কূটনতিক অর্থনীতিতে গুরুত্বারোপ করা। কারণ অর্থনীতির প্রসার ও সরকারের রূপরেখা অর্জনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।

নতুন বাজার সৃষ্টি: বাংলাদেশ এখন পোষাক শিল্পে দ্বিতীয়, চামড়া শিল্পে রয়েছে প্রথমকাতারে। এছাড়া ঔষধ শিল্পে সৃষ্টি হয়েছে সম্ভাবনার নতুন দ্বার। আমাদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বাহারি পণ্যযাচ্ছে ইউরোপ আমেরিকার নানা দেশে। এসব ক্ষেত্রে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সে লক্ষ্যে আমাদের কূটনতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করলে রপ্তানি আয় কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

অর্থনৈতিক কূটনীতি গুরুত্ব বিশ্লেষণ

দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে: দেশে মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশিনেওয়া হয়েছে “ডেল্টা প্ল্যান-২১০০”। উন্নত দেশের পথে হাটতে হলে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গঠনে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অন্তত ৯ বা ১০ শতাংশ অর্জন করতে হবে। ১০০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গঠন করা হবে ডেল্টা তহবিল। এই তহবিলের উৎস হিসেবে বাংলাদেশ সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, পরিবেশ ও জলবায়ু সম্পর্কিত তহবিল, বিশেষ করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে বিবেচনা করেছে। বিপুল পরিমাণ এই অর্থের বড় একটি অংশ আসতে পারে প্রবাসীদের কাছ থেকে। এ লক্ষ্যে কূটনতিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।

বিদেশি বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা: আমাদের দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে নেওয়া নতুন প্রকল্প গ্রহণ কিংবা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মতো কর্মসূচিতে সরকারের একার পক্ষে অর্থায়ন কঠিন। এক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট জরুরি এতে করে বহু কর্মসংস্থান হবে ও উৎপাদন বাড়বে। আর উৎপাদন যত বাড়বে অর্থের সঞ্চালনও হবে তত বেশি।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের সমস্যা: ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বিশ্বব্যাপী উষ্ণ বৃদ্ধির কারণে জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটছে। ভূ-খণ্ডগত গভীরতা না থাকায় সশস্ত্র সংঘাতের সময় বাংলাদেশের বিপদে পড়ার সমূহ সম্ভবনা রয়েছে। সমুদ্রের সম্মুখভাগ অনেক ছোটো এবং এর উপকূল ফানেল টাইপের হওয়ায় সমুদ্রে প্রবাহ করার ক্ষেত্রেও অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে বাংলাদেশকে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক এবং ভূ-কৌশলগত দুর্বলতা হলো ভারত থেকে বাংলাদেশের যেকোনো পয়েন্টে ৮০ মাইলের বেশি দূরে অবস্থান করা সম্ভব নয়। সীমান্তের এই কাছাকাছি অবস্থান ভারতের সাথে ভবিষ্যৎ যেকোন সামরিক দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষায় বড় ধরনের দুর্বলতা হিসেবে উপস্থিত হতে পারে।

ভৌগোলিক অবস্থানের সম্ভবনাসমূহ: বাংলাদেশ দক্ষিন এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে দূরত্ব সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই দেশটিকে সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ স্থান দিয়েছে।

ভূ-কৌশলগত: বাংলাদেশের তিন দিক ভারত বেষ্টিত। অবস্থানের দিক থেকে
বাংলাদেশ নাজুক হলেও এর সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ৯০ পূর্ব দ্রাঘিমা অতিক্রম করেছে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝামাঝি। এই ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধার কারণে দেশটি ব্যবসায়-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের গতি অনেক বাড়িয়ে দেয়ার সম্ভবনা রাখে।

খনিজ সম্পদ: নদী বাহিত পলল দ্বারা বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা সৃষ্ট হলেও এ দেশেরএকটা বৃহৎ এলাকাজুড়ে রয়েছে প্রাচীন ভূ-ভাগ, সেসকল এলাকাগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, ইউরেনিয়াম মৃত্তিকা পানি সম্পদসহ বহু প্রাকৃতিক সম্পদ। অর্থনৈতিক কূটনীতি গুরুত্ব বিশ্লেষণ

মৎস্য সম্পদ: FOW এর মতে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মহীসোপানকে “স্বর্ণখনি” বলা হয়েছে। কারণ এখানে প্রচুর পরিমাণ মৎস্য সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৪৭৬ প্রজাতির মৎস্য সম্পদ রয়েছে যা আহরণ করতে পারলে প্রতি বছর বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের সমান অর্থ উপার্জন করা সম্ভব।

আঞ্চলিক অর্থনীতি: বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী হিসেবে অবস্থিত। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার এবং চীন একটি শক্তিশালী ভূ-অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলেছে।
সামরিক কৌশল: সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে এ অঞ্চল ভারত মহাসাগরের প্রবেশ দ্বার হিসেবে বিবেচিত। ভূ-গঠনগত দিক দিয়ে গত সহস্রাব্দ ধরে বাংলাদেশ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এবং আকর্ষণীয়। বাংলাদেশ আন্তঃমহাদেশীয়ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করলে আশপাশের প্রায় ৪৮২৭ কিলোমিটার পর্যন্ত ধ্বংসলীলা চালানো সম্ভব হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top