বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগ
বাংলা সাহিত্যে ‘অন্ধকার যুগ’-এর অস্তিত্ব সম্পর্কে মতামত দিন।
— বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ১২০১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ সময়কালকে কেউ কেউ অন্ধকার যুগ বলে অভিহিত করেন। এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না। তুর্কি আক্রমণে বাঙালি সমাজ ও জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার কারণে মানুষ সাহিত্য রচনায় আগ্রহী হতে বাধ্য হয়। এই সময় ‘শূন্যপুরাণ’ ও ‘সেক শুভোদয়া’ নামে দুটি সংস্কৃত গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। নিচে এ দুটি গ্রন্থ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলোঃ
শূন্যপুরাণ: ‘শূন্যপুরাণ’ বিশেষভাবে ধর্মগ্রন্থধর্মী। গ্রন্থটি ৫টি অধ্যায়ে বিভক্ত। গ্রন্থটির লেখক কে তার সুনির্দিষ্ট হদিস পাওয়া যায়নি। তবে গ্রন্থটিতে তৎকালীন জীবনের ছবি পাওয়া যায় বলে মনে হয় গ্রন্থটি রামাই পণ্ডিত রচিত। এই কাব্যে ‘শূন্য’ দেবতা ধর্ম ঠাকুরের পূজা পদ্ধতির বর্ণনা আছে। এটি একটি চক্রাকার।
সেক শুভোদয়া: অর্ধ বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় মিশ্রিত গ্রন্থ। এর রচনাকাল ‘বোড়া’ শতাব্দীর মধ্যে। পদ্য-পদ্য মিলিয়ে গ্রন্থটিতে ২টি অধ্যায় আছে। রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি হলায়ুধ মিশ্র গ্রন্থটির রচয়িতা। ‘সেক শুভোদয়া’ অর্থাৎ সেকের গৌরব ব্যাখ্যাই এই পুস্তিকার উদ্দেশ্য। এতে নানা ঘটনার মাধ্যমে মুসলমান দরবেশের চরিত্র ও আদর্শের পরিচয় দেওয়া হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলতে কী বোঝেন?
— ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে ‘মধ্যযুগ’ বলে বিবেচিত। কিন্তু এর মধ্যে ১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ— এই ১৫০ বছরকে কেউ কেউ অন্ধকার যুগ বলে চিহ্নিত করেন। বাংলায় তুর্কি বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমান শাসনামলের সূত্রপাতের পরিপ্রেক্ষিতে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি না হওয়ায় এ সময়কালকে অন্ধকার যুগ বলা হয়। তুর্কি বিজয়ের ফলে মুসলিম শাসনামলের সূত্রার পটভূমিতে সমাজে নানা অস্থিরতা বিরাজমান ছিল। ফলশ্রুতিতে কেবল শূন্যপুরাণ, সেক শুভোদয়া, ডাক ও খনার বচন ছাড়া এ সময়ে তেমন কোনো সাহিত্য রচিত হয়নি। সাহিত্যের এই অস্থির অবস্থার জন্যই এ সময়টিকে অন্ধকার যুগ বলা হয়।
চর্যাপদের ভাষাকে কেন “সন্ধ্যা ভাষা” বা “আলো-আধারি ভাষা” বলা হয়?
— চর্যাপদের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর ভাষাকে ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বলেছেন। কেননা এর ভাষা দ্ব্যর্থপূর্ণ। কিছুটা স্পষ্ট আবার কিছুটা অস্পষ্ট। যে ভাষায় অল্পই অর্থ বুঝতে হয় অনুমানের মাধ্যমে, তা-ই সন্ধ্যা ভাষা। বহু পদগুলোর রচয়িতাগণ ছিলেন বৌদ্ধ সাধক। তারা সাধনা করতেন গোপন তত্ত্বের যা তারা রহস্যপূর্ণ ইঙ্গিত, উপমা বা রূপকের দ্বারা প্রকাশ করতেন। ভাষার এ দুর্বোধ্যতার কারণে পণ্ডিতগণ এ ভাষাকে ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বলেছেন।
অন্ধকার যুগের সাহিত্যিক নিদর্শন না পাওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলো নিম্নরূপঃ
ক. ধর্ম প্রচারের কিংবা রাজা শাসনের বাহন হয়নি বলে বাংলা ভাষা তুর্কি বিজয়ের পূর্বে লেখ্য ভাষায় মর্যাদা পায়নি।
খ. তের-চৌদ্দ শতক পর্যন্ত বাংলা ভাষা উচ্চবিত্ত মানুষের সাহিত্যচর্চার যোগ্য হয়ে ওঠেনি বলে।
গ. সংস্কৃতের চেয়ে নিম্ন কোন ভাষাতে চৌদ্দ শতকের পূর্বে রসসাহিত্য রচিত হয়নি। তুর্কি বিজয়ের পর প্রাকৃতজনেরা প্রশ্রয় পেয়ে বাংলা ভাষা রচনা করেছে মুখে মুখে। তাই লিখিত সাহিত্য অনেককাল পরে ওঠেনি।
ঘ. তের-চৌদ্দ শতকে সংস্কৃত চর্চার কেন্দ্র ছিল হিন্দু শাসিত মিথিলায়, তাই এসময় বাংলাদেশে সংস্কৃত সহ অন্য ভাষার চর্চা হয়নি।
ঙ. মধ্যযুগের শুরুতে বাংলায় কিছু পুঁথিপত্র রচিত হলেও জনপ্রিয়তার অভাবে, ভাষার বিবর্তন এবং অনুলিপি করার গরজ ও আগ্রহের অভাবে তা নষ্ট হয়েছে। আগুন-পানি-উঁই-কীট তো রয়েছেই।
চ. লিখিত হলেও কালের প্রবাহে লুপ্ত হওয়ার বড় প্রমাণ চর্যগীতি, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, সেক শুভোদয়া গ্রন্থটির একাধিক পাণ্ডুলিপির অভাব।
ছ. চর্যগীতি রচনার শেষ সীমা যদি বার শতক হয়, তাহলে তের-চৌদ্দ শতক বাংলা ভাষার গঠনযুগ তথা স্বরূপ প্রাপ্তির যুগ। কাজেই এ সময়কালে কোন লিখিত রচনা না থাকাই কথা।
জ. দেশজ মুসলমানের ভাষা চিরকালই বাংলা। বাংলায় লেখার রেওয়াজ থাকলে তুর্কিবিজয়ের পূর্বের বা পরের মুসলমানের রচনা নষ্ট হওয়ার কারণ ছিল না।
অন্ধকার যুগের সৃষ্টি ‘শূন্যপুরাণ’ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
— রামাই পণ্ডিত রচিত ধর্মপ্রচারের শাস্ত্রগ্রন্থ ‘শূন্যপুরাণ’। রামাই পণ্ডিতের কাল তের শতক বলে অনুমিত হয়। ‘শূন্যপুরাণ’ ধর্মীয় তত্ত্বের গ্রন্থ — গদ্যপদ্য মিশ্রিত চমৎকার। এতে বৌদ্ধদের শূন্যবাদ ও হিন্দুদের লৌকিক ধর্মের মিশ্রণ ঘটেছে। এ গ্রন্থের অন্তর্গত ‘নিরঞ্জনের উষা’ কবিতাটি থেকে প্রমাণিত হয় যে, তা ‘মুসলমান তুর্কি কর্তৃক বঙ্গবিজয়ের পরে’, অন্ততঃ ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকের রচনা। এতে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বৌদ্ধদের উপর বৈদিক ব্রাহ্মণদের অত্যাচার কাহিনি বর্ণনার সঙ্গে মুসলমানদের রাজপুড়ে প্রবেশ এবং ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর রাতারাতি ধর্মান্তর গ্রহণের কল্পনিক চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। এর ভাষার কিছু নিদর্শন,
“আপনি চক্রিকা দেবী তিঁহু হইলা হায়া বিবি,
পদ্মাবতী হইলা বিবি নূর ॥”
অন্ধকার যুগের সৃষ্টি ‘সেক শুভোদয়া’র সংক্ষিপ্ত পরিচয়
— রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি হলায়ুধ মিশ্র রচিত ‘সেক শুভোদয়া’ সংস্কৃত গদ্যপদ্যে লেখা চমৎকার। গ্রন্থটি রাজা লক্ষ্মণ সেন ও শেখ জালালুদ্দীন তাবরেজির অলৌকিক কাহিনি অবলম্বনে রচিত। ‘সেক শুভোদয়া’ অর্থাৎ শেখের গৌরব ব্যাখ্যাই এই পুস্তিকার উদ্দেশ্য। এতে নানা ঘটনার মাধ্যমে মুসলমান দরবেশের চরিত্র ও অলৌকিকতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। এ গ্রন্থে প্রাচীন বাংলার যেমন নিদর্শন আছে তা হল বীর মাহাত্ম্যজ্ঞাপক বাংলা ছড়া বা আর্যা, খনার বচন ও ডাকিয়ানি গানের একটি প্রেমসঙ্গীত। গ্রন্থটিতে ২৫টি অধ্যায় আছে।
ডাক ও খনার বচন
— ‘ডাক ও খনার বচন’ কে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীননমুনার সৃষ্টি বলে বিবেচনা করা হয়। ‘তিব্বতি’ ভাষায় ডাক ও খনা শব্দদ্বয়ের অর্থ ‘প্রজ্ঞাবান’। শুভাশুভ, নীতি, বিধিবিধান ও উপদেশবাচক প্রজ্ঞোক্তিই ডাক ও খনার বচনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ‘খনার বচন’ রচয়িতার প্রকৃত নাম ‘লীলাবতী’। খনার বচনে কৃষি ও লোকজীবনকেন্দ্রিক বিচিত্র অভিজ্ঞতা সন্নিবেশিত হয়েছে। ফসল, উদ্ভিদ সংক্রান্ত নানা দিকনির্দেশনা ছাড়াও প্রকৃতি ও দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার নানা উপদেশ এতে রয়েছে। ‘ডাক’ ছিলেন প্রাচীন বাংলার একজন বচনকার। ডাকের বচনে সাধারণত জ্যোতিষ, ক্ষেত্রতত্ত্ব ও মানব চরিত্রের ব্যাখ্যা প্রাধান্য পেয়েছে। অপরদিকে খনার বচনে কৃষি ও আবহাওয়ার কথা প্রাধান্য পেয়েছে।
বাংলায় ডাক ও খনার উক্তি বচনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ডাকের কথা ও খনার বচন প্রাচীন বাংলা ও আসামের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূল্যবান রচনা করেছিল। বাঙালির দৈনন্দিন কার্যকলাপ, আচার-অনুষ্ঠান, সংস্কার ও বিশ্বাস আজও জ্ঞান-অজ্ঞাতসারে ডাক ও খনার বচন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
ডাক ও খনার বচনের বৈশিষ্ট্যঃ
১. ডাক খনার বচনের বর্তমান ভাষা তার মূল ভাষা নয়, তবে লীলাবতী আর্যার ভাষা অনেকটা মূল ভাষার কাছাকাছি।
২. ডাক ও খনার বচনে মাঝে মাঝে ভগ্নিতা আছে, যা লোকসাহিত্যের অন্য শাখায় সচরাচর লক্ষ্য করা যায় না।
৩. ডাকের কথা ও খনার বচনে লোকায়ত বাংলার স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে।
৪. ডাকের কথা মোটামুটি একই ছলে রচিত, কিন্তু খনার বচনে ছন্দবৈচিত্র্য আছে।
৫. খনার বচনে ব্যবহারিক কথা, আর ডাকার কথায় নীতিকথা বেশি।
৬. ডাক ও খনার বচনের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। মৌখিকভাবে প্রচলিত ও স্মৃতি আশ্রিত বলে বহু বচন লোপ পেয়েছে।
