loader image

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতা

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতা
প্রাচীন কালে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বহু সভ্যতা গড়ে ওঠে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সভ্যতা নিচে তুলে ধরা হলো।

মেসোপটেমিয়া সভ্যতা
বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতা মেসোপটেমিয়া। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে ইরাকে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর উর্বর তীরাঞ্চলে মেসোপটেমীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটে। মেসোপটেমিয়া একটি গ্রিক শব্দ। এর অর্থ দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি।

সুমেরীয় সভ্যতা
মেসোপটমিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা গড়ে তুলেছিল সুমেরীয়গণ। পশ্চিম এশিয়ার মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে প্রথম যে সভ্যতা গড়ে ওঠে তাকে সুমেরীয় সভ্যতা বলে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গবেষণা করে বেশিরভাগ ঐতিহাসিক একমত হয়েছেন সুমেরীয়দের আদি বাসস্থান সুমের ছিল না। তাঁদের অনেকের মতে, সুমেরীয়দের একটি দল ৪০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের দিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষত এলামের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উর্বর ভূমির দিকে অগ্রসর হয়েছিল। সুমেরীয়দের সবচেয়ে বড় অবদান “ঢাকা” আবিষ্কার।

ব্যাবিলনীয় সভ্যতা
সিরিয়ার মরুভূমি অঞ্চলে অ্যামোরাইট নামের এক জাতি বাস করত। এরা খ্রিস্টপূর্ব ১৮৯৪ অব্দে মেসোপটেমিয়ায় এসে সুমের ও আক্কাদ নগরীর মাঝামাঝি ব্যাবিলন নামক স্থানে একটি সভ্যতা গড়ে তোলে। এটিই ব্যাবিলনীয় সভ্যতা নামে পরিচিত। ব্যাবিলন শব্দটির অর্থ “দেবতার নগরী”। ব্যাবিলনীয় সভ্যতার স্থপতি ছিলেন বিখ্যাত অ্যামোরাইট নেতা হাম্মুরাবি। পৃথিবীতে প্রথম লিখিত আইনের প্রচলন হয় ব্যাবিলনে। প্রথম লিখিত আইন প্রণেতা ছিলেন ব্যাবিলনীয় সভ্যতার স্থপতি হাম্মুরাবি।

অ্যাসেরীয় সভ্যতা
ব্যাবিলন থেকে প্রায় দুইশত মাইল উত্তরে টাইগ্রিস নদীর তীরে ‘আশুর’ নামে একটি সমৃদ্ধ শহর গড়ে উঠে। অ্যাসিরীয়রা প্রথম বৃত্তকে ৩৬০° তে ভাগ করে। পৃথিবীকে সর্বপ্রথম তারা অক্ষাংশ (Latitudes) ও দ্রাঘিমাংশে (Longitudes) ভাগ করেছিল।

ক্যালডীয় সভ্যতা
ব্যাবিলন শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠায় ক্যালডীয় সভ্যতা ইতিহাসে ‘নতুন ব্যাবিলনীয় সভ্যতা’ নামেও পরিচিত। ক্যালডীয় সভ্যতার স্থপতি ছিলেন সম্রাট নেবুচাদনেজার। ‘ব্যাবিলনের শূন্য উদ্যান’ (The Hanging Garden of Babylon) নির্মাণের জন্য তিনি অমর হয়ে আছেন।
‘ব্যাবিলনের শূন্যউদ্যান’ (The Hanging Garden of Babylon) প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি। ক্যালডীয়রাই প্রথম সপ্তাহকে ৭ দিনে বিভক্ত করে।

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা
মিশরে নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে। নীল নদকে কেন্দ্র করে মিশরের এ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস মিশরকে বলেছেন ‘নীল নদের দান’।
লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন
অক্ষরভিত্তিক মিশরীয় চিত্রলিপিকে বলা হয় ‘হায়ারোগ্লিফিক’ যা একটি গ্রিক শব্দ। ‘হায়ারোগ্লিফিক’ অর্থ পবিত্রলিপি। এখানে ২৮২টি অক্ষর বিদ্যমান।

সিন্ধু সভ্যতা
এ প্রাচীন সভ্যতা আবিষ্কৃত হয় ১৯২১ সালে। সভ্যতাটি সিন্ধু নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল বলে এটি ‘সিন্ধু সভ্যতা’ নামে পরিচিত। দ্রাবিড় জাতি এ সভ্যতা গড়ে তুলেছিল বলে মনে করা হয়। হরপ্পা নগরীটি গড়ে উঠেছিল সিন্ধুর উপনদী রাভী’র তীরে। এটি অবস্থিত বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে। আর মূল সিন্ধুনদের তীরে এক বর্গমাইল এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছিল মহেঞ্জোদারো নগরী।
১৯২২ সালে পাকিস্তানের লারকানা জেলায় মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করা হয় মহেঞ্জোদারো নগরীর ধ্বংসাবশেষ। সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কারক জন মার্শাল, দয়ারাম সাহনী ও রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাই বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার জন মার্শাল মনে করেন যে, সিন্ধু সভ্যতা গৌরবের শিখরে উঠেছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩২৫০ থেকে ২৭৫০ অব্দের মধ্যে। সিন্ধু সভ্যতার পতন শুরু হয় আনুমানিক ২৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।

ফিনিশীয় সভ্যতা
লেবানন পর্বত এবং ভূমধ্যসাগরের মাঝামাঝি এক ফালি সরু ভূমিতে ফিনিশীয় রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। কৃষিকাজ করার মত এখানে উর্বর জমি ছিলোনা। তাদের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল বাণিজ্য।

পারস্য সভ্যতা
আজকের ইরান প্রাচীনকালে পারস্য নামে পরিচিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দ থেকে ৬০০ অব্দের মধ্য এখানে আর্যরা এক উন্নত সভ্যতা গড়ে তোলে। এ সভ্যতার অধিবাসীর। সামরিক শক্তিতে খ্যাতিমান ছিল। সভ্যতার ইতিহাসে দুইটি ক্ষেত্রে পারসীয়দের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি সুষ্ঠ ও দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দ্বিতীয়টি ধর্মীয় ক্ষেত্রে নতুন ধারণা নিয়ে আসা। জরথুস্ট্র নামে পারস্যে এক ধর্মগুরু ও দার্শনিকের আবির্ভাব ঘটে। জরথুস্ট্র কর্তৃক প্রবর্তিত ধর্ম ‘জরথুস্ট্রবাদ’ নামে পরিচিত। পারস্যের ইতিহাসে কাইরাস ও দারিয়ুস ছিলেন সবচেয়ে সফল শাসক। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার অধিকার করে নেন সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্যকে।

হিব্রু সভ্যতা
প্যালেস্টাইনের জেরুজালেম নগরীকে কেন্দ্র করে হিব্রু সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। হিব্রু কোনো জাতির নাম নয়। ‘হিব্রু’ একটি সেমেটিক ভাষা। এ ভাষায় কথা বলা লোকেরাই হিব্রু নামে পরিচিত। হিব্রুদের আদিবাস ছিল আরব মরুভূমিতে। বর্তমান ইসরাইলের অধিবাসীরা হিব্রুদের বংশধর। হিব্রুরা তাদের অবদানের পুরোটাই রেখেছে ধর্মীয় ক্ষেত্রে। হিব্রুরা সর্বপ্রথম একেশ্বরবাদের কথা ব্যাপকভাবে প্রচার করে। অবশ্য অনেককাল পূর্বে মিশরের ফারাও ইখনাটন এক দেবতার আরাধনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তা তেমন জনপ্রিয় হতে পারেনি। হিব্রুদের নবী হযরত মুসা (আ.), হযরত দাউদ আ. এবং হযরত সুলায়মান (আ.) মানুষের প্রচলিত ধর্মীয় চেতনায় নতুন আলোড়ন তোলেন।

প্রাচীন চৈনিক সভ্যতা
তিনটি অঞ্চলে প্রাচীন চৈনিক সভ্যতা বেড়ে উঠতে থাকে। প্রথমটি হোয়াংহো (পীত নদী) নদীর তীরে, দ্বিতীয়টি ইয়াংসিকিয়াং নদীর তীরে আর তৃতীয়টি দক্ষিণ চীনে গড়ে উঠেছিল।
দর্শন চীনের প্রাচীনতম দার্শনিক ছিলেন লাওৎসে। তাঁর মতবাদের নাম ছিল তাওবাদ চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক ছিলেন কনফুসিয়াস (৫৫১-৪৭৯ খ্রি. পূ.)। খ্রি. পূর্ব ২০৬ অব্দে তাঁর দর্শন চীনে ধর্মে পরিণত হয়।

গ্রিস ও এশিয়া মাইনরকে পৃথক করেছে ইজিয়ান সাগর। এই ইজিয়ান সাগর জুড়ে ছিল ছোট বড় অনেক দ্বীপ। ইজিয়ান সাগরের দ্বীপমালা ও এশিয়া মাইনরের উপকূলে একটি উন্নত নগর সভ্যতা গড়ে উঠে। ইতিহাসে এ সভ্যতা ইজিয়ান সভ্যতা নামে পরিচিত। গ্রিসে সভ্যতা গড়ে তোলার প্রস্তুতি পর্ব ছিল এ সভ্যতা। ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইজিয়ান সভ্যতার পতন ঘটে।

গ্রিক সভ্যতা
‘গ্রিক’ ও ‘গ্রিস’ শব্দ দুটি যথাক্রমে জাতি ও দেশ। গ্রিক সভ্যতায় অনেকগুলো ছোট ছোট নগর রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। গ্রিসকে গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলা হয়। গ্রিসের ভৌগোলিক পরিবেশ ছিল একটু ভিন্ন ধরনের। এ অঞ্চলে অনেকগুলো পাহাড় দাঁড়িয়ে ছিল দেয়ালের মত। ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ হয়ে যায় দেশটি।এ ছোট দেশগুলোর নাম হয় নগর রাষ্ট্র।
গণতন্ত্রের সুতিকাগার যুক্তরাজ্যে
প্রাচীনতম গণতন্ত্র প্রচলিত সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ
গ্রিস-ভারত
এদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিল স্পার্টা ও এথেন্স। স্পার্টা ছিল একটি সামরিক নগর রাষ্ট্র। রাষ্ট্রনেতারা ছিল স্বৈরাচারী। পক্ষান্তরে প্রতিবেশী এথেন্স ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের অধিকার থাকলে

সে ব্যবস্থাকে বলে গণতন্ত্র। প্রাচীন পৃথিবীতে এথেন্সই সর্বপ্রথম গণতন্ত্রের সূচনা করে। এথেন্সে চূড়ান্তভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন পেরিক্লিস। পেরিক্লিস এথেন্সের ক্ষমতায় আসেন ৪৬০ খ্রিস্টাব্দে। এশিয়া মাইনরে প্রথম লোহা আবিষ্কৃত হয়।

পেলোপনেসীয় যুদ্ধ
স্পার্টা ও এথেন্স উভয় দেশ একে অন্যের শত্রু ছিল। এথেন্স তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একটি জোট গঠন করে। এর নাম হয় ‘পেলোপনেসীয় লীগ’ নামে পরিচিত। ৪৬০ থেকে ৪০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মোট তিনবার যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে চূড়ান্ত পতন ঘটে এথেন্সের।

ভৌগোলিক অবস্থান
প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক কারণে গ্রিক সভ্যতার সাথে দুইটি সংস্কৃতির নাম জড়িয়ে আছে। একটি ‘হেলেনিক’ (Hellenic) এবং অন্যটি ‘হেলেনিস্টিক’ (Hellenistic)। গ্রিসকে হেলেনীয় সভ্যতার দেশ বলা হয়। গ্রিসের প্রধান শহর এথেন্সে শুরু থেকেই যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তাকে বলা হয় হেলেনিক সংস্কৃতি। গ্রিস উপদ্বীপ ছিল এ সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৭ অব্দ পর্যন্ত হেলেনিক সভ্যতা টিকে ছিল। এ সময় মিশরের আলেকজান্দ্রিয়াকে কেন্দ্র করে গ্রিক সংস্কৃতি ও অগ্রিক সংস্কৃতির মিশ্রণে এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়। ইতিহাসে এ সংস্কৃতির পরিচয় হয় হেলেনিস্টিক সংস্কৃতি নামে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top