সৈয়দ আলাওল
আলাওলের জন্মস্থান ফরিদপুর জেলার ফতেহাবাদ পরগনার জানালপুর গ্রামে (মতান্তরে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফতেহাবাদের জোয়ারা)। ড. শহীদুল্লাহর মতে, তাঁর জন্ম-মৃত্যু ১৫৯৭–১৬৭৩ খ্রিষ্টাব্দ। ড. এনামুল হকের মতে, তাঁর জন্ম-মৃত্যু ১৬০৭–১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ। তাঁর পিতা ছিলেন ফতেহাবাদের অধিপতি মজলিশ কুতুবের একজন আমাত্য। পিতার সঙ্গে নৌকাযোগে যাবার সময় পর্তুগীজ জলদস্যু দ্বারা আক্রান্ত হলে আলাওলের পিতা নিহত হন এবং আলাওল বন্দি হয়ে আরাকানে ফিরিঙ্গিদের দাস হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি আরাকানে প্রথমে দেহরক্ষীর কাজ করেন। পরে মহলের গৃহে নাচগীত ও সঙ্গীত শিক্ষকের কাজ করেন।
আলাওল মধ্যযুগের (সপ্তদশ শতকের) সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুসলমান কবি। মধ্যযুগের বাংলা কবিদের মধ্যে তাঁর স্থান অতি উচ্চে। সংস্কৃত, বাংলা, আরবি, ফারসি ও হিন্দি ভাষায় তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত। তিনি যোগশাস্ত্র, সঙ্গীতবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন। এসব গুণের জন্য তিনি রাজদরবারে অনুকূল লাভ করেন। ১৬৫৯–৬০ সালে শাহ সুজা আরাকানে আশ্রয়প্রার্থী হন এবং বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে নিহত হন। এ বিদ্রোহে জড়িত থাকার অভিযোগে আলাওল পক্ষাঘাত দণ্ড কারাভোগ করেন।
আলাওল রোমাঞ্চ রাজসভার শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত কবি। তাঁর জীবনে মাধব ঠাকুরের প্রভাব অপরিসীম। ‘পদ্মাবতী’ তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য। তাঁর অন্যান্য কাব্য—সয়ফুলমূলুক-বদিউজ্জামাল, সপ্তপয়কর, তোহফা, সতীময়না লোরচন্দানী (৩য় খণ্ড), সিকান্দরনামা।
পদ্মাবতী →
কবি আলাওল হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সী রচিত হিন্দি (প্রণয়াখ্যান ‘পদুমাবৎ’) অবলম্বনে রচনা করেন রোমান্টিক ‘পদ্মাবতী’ কাব্য ১৬৪৮ সালে। এটি আলাওলের শ্রেষ্ঠ কাব্য। কাব্যটি রচনা করেন মাধব ঠাকুরের অনুপ্রেরণায়। ‘পদ্মাবতী’ কাব্যের নায়ক ও নায়িকা হলেন রত্নসেন ও সিংহল রাজকন্যা পদ্মাবতী। এ কাব্যে হিরামন নামক শুক পাখির অনেক ভূমিকা আছে। পদ্মাবতী পুঁথি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ। এ কাব্যে আলাওল ব্যক্তিগত জীবনের কথা লিখেছেন। সৈয়দ আলাওল
এ কাব্যের একটি বিখ্যাত চরণ :
রক্ত উৎপল লাজে জলান্তরে বৈসে।
তাঞ্জুল রাতুল হৈল অধর পরশে॥
রাতুল মানে হলো লাল আর পানের আরেক নাম তাঞ্জুল; পানের পিকের তামাটে রঙের দিকে খেয়াল রেখে সংস্কৃত ভাষা থেকে তাঞ্জুল শব্দটি এসেছে। তাই সংস্কৃত ভাষায় পানকে তাঞ্জুল বলা হয়।
খণ্ডবর্ণন খণ্ডে কবি বলেন,
নবীন খঞ্জন দেখি বড়ই কৌতুক।
উপচিত যামিনী দস্পতি মনে সুখ॥
……..
……..
পুষ্প শয্যা ভেদ ভুলি বিচিত্র নিবারণ।
উরে উরে এক হৈলে শীত নিবারণ॥
সমফুলমূলুক-বদিউজ্জামাল →
আরাকান রাজের অমাত্য সৈয়দ মুসার অনুপ্রেরণায় ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে কবি আলাওল ‘সমফুলমূলুক-বদিউজ্জামাল’ রচনা আরম্ভ করেন। মাধব ঠাকুরের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়ে রচনা বন্ধ করে দেন। পরে আনুমানিক ১৬৬৯ খ্রিষ্টাব্দে সৈয়দ মুসার অনুরোধে তা সমাপ্ত করেন। এটি তাঁর দ্বিতীয় কাব্য। ‘সমফুলমূলুক-বদিউজ্জামাল’ গ্রন্থের কাহিনীর আদি উৎস আলিফ লায়লা বা আরব্য রজনী।
সতীময়না ও লোরচন্দানী →
দৌলত কাজীর অসমাপ্ত গ্রন্থ ‘সতীময়না ও লোরচন্দানী’ অবশিষ্টাংশ আরাকানরাজ শ্রীচন্দ্র সুধর্মার অমাত্য সোলেমানের উৎসাহে ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে সমাপ্ত করেন আলাওল। এটি তাঁর তৃতীয় রচনা। তবে এতে তাঁর নিজস্ব সংযোজন হিসেবে ‘রত্নকলিকা আনন্দবর্ণনা’ খণ্ড।
সপ্তপয়কর →
পারস্য কবি নিজামী গঞ্জবীর ‘হপ্তপয়কর’ কাব্যের অনুবাদ করেন আলাওল। অন্যান্য কাব্যের মতো এটিও তাঁর ভাবানুবাদ। ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান রাজের সমমন্ত্রীর সৈয়দ মুহাম্মদের অনুরোধে ‘সপ্তপয়কর’ নামে এ কাব্য রচনা করেন। এটি আলাওলের চতুর্থ কাব্য।
তোহফা →
বিখ্যাত সুফী সাধক শেখ ইউসুফ গদা দেহলভীর ‘তোহফাতুন নেসায়েহ’ নামক গ্রন্থ অবলম্বনে ‘তোহফা’ আলাওলের পঞ্চম গ্রন্থ। আলাওল ‘তোহফা’ রচনা করেন ১৬৬৩–৬৪ সালে, শ্রীচন্দ্র সুলেমানের অনুরোধে। এটি নীতিকাব্য ধরনের ধর্মীয় গ্রন্থ। গ্রন্থটি ইসলাম ধর্মের তত্ত্বোপদেশপূর্ণ। কাব্যাকারে রচিত হলেও মূলত ধর্মীয় নীতিকথাই এতে প্রাধান্য পেয়েছে।
সিকান্দরনামা →
আলাওলের ষষ্ঠ কাব্য ‘সিকান্দরনামা’। এটি ফারসি কবি নিজামী গঞ্জবীর ‘সেকান্দরনামা’র অনুবাদ। আরাকানরাজ চন্দ্র সুধর্মার নবরাজ উপাধিধারী মজলিশ নামক জনৈক অমাত্যের অনুপ্রেরণায় কাব্যটি রচিত হয়। সম্ভবত ১৬৭২ সালে কবির বৃদ্ধ বয়সের রচনা এটি। কবি তখন শোকতাপ ও অর্থকষ্টে বিপর্যস্ত। সেকান্দর বা আলেকজান্ডারের দিগ্বিজয় এ কাব্যের মূল কাহিনি। আলেকজান্ডারের পিতা ফিলিপ, শিক্ষাগুরু এরিস্টটল, পারস্যরাজ দারায়ুস প্রভৃতির কাহিনি এ কাব্যে বর্ণিত হয়েছে।
এছাড়া একজন সঙ্গীতবিদ হিসেবে তিনি রচনা করেন রাগতালের ধ্যান ধারণা ও ব্যাখ্যা সংবলিত ‘রাগতালনামা’। এটি আলাওলের সঙ্গীতবিষয়ক কাব্য। এ সময় তিনি কতিপয় গানও রচনা করেন। এগুলো তাঁর মৌলিক রচনা। এছাড়া তিনি বাংলা ও ব্রজবুলিতে বৈষ্ণব পদও রচনা করেন। সৈয়দ আলাওল
আলাওল ‘পণ্ডিত কবি’
— আরাকান রাজসভার প্রধান ও শ্রেষ্ঠ কবি আলাওল। বিদ্যা, বুদ্ধি ও প্রতিভায় তিনি অপরাপর কবির তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তিনি আরবি, ফারসি, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। তিনি ছিলেন গীতিকার, সুরকার ও সুগঠ গায়ক। তিনি আরাকান রাজসভার পণ্ডিত হিসেবে খ্যাত। আলাওলের শ্রেষ্ঠ কাব্যের নাম ‘পদ্মাবতী’। এ কাব্যে আলাওল মানব মানবীর প্রেম রূপায়িত করেছেন, নারীর রূপ বর্ণনায় অতিবুদ্ধ এনেছেন। তাই আলাওলকে পণ্ডিত কবি বলা হয়।
আলাওলের গ্রন্থসমূহের নাম
— আলাওল মধ্যযুগের সর্বাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর মোট কাব্যের সংখ্যা সাতটি। ‘পদ্মাবতী’, ‘সমফুলমূলুক বদিউজ্জামাল’, ‘সতীময়না-লোরচন্দানী’ (শেষ অংশ), ‘সপ্তপয়কর’, ‘তোহফা’, ‘সেকান্দরনামা’, সঙ্গীতবিষয়ক কাব্য ‘রাগতালনামা’ তাঁর রচিত সাহিত্যক নিদর্শন। এ ছাড়াও বৈষ্ণব পদাবলির অনুসরণে তাঁর কিছু গীতিকবিতা আছে।
আলাওলের শ্রেষ্ঠ কাব্যের নাম ‘পদ্মাবতী’। এটি ইতিহাসমিশ্রিত প্রেমমূলক কাব্য, যাতে প্রেমই কাব্যের প্রাণ। ‘পদ্মাবতী’ রচিত হয় ১৬৪৮ সালে। কবি আলাওল কোচবিহারী মাধব ঠাকুরের নির্দেশে ‘পদ্মাবতী’ কাব্য রচনা করেন।
— মধ্যযুগের মুসলিম কবি আলাওলের অমর কীর্তি ‘পদ্মাবতী’ কাব্য। ‘পদ্মাবতী’ একটি ঐতিহাসিক প্রণয় উপাখ্যান। হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ (১৫৪০) এর অনুসরণে এটি রচিত হয়। পদ্মাবতী কাব্যের প্রধান চরিত্রগুলো হলো রত্নসেন, পদ্মাবতী, হীরামণি ও সুলতান আলাউদ্দিন। চিতোরের রাণী পদ্মিনীর কাহিনি নিয়ে কবি আলাওল পদ্মাবতী কাব্যের কাহিনি দাঁড় করিয়েছেন। পদ্মাবতী কাব্যের নায়ক ও নায়িকা হলেন রত্নসেন ও পদ্মাবতী। শুকপাখি হীরামণির মাধ্যমে চিতোরের রাজা রত্নসেন ও সিংহলের রাজকন্যা পদ্মাবতীর প্রেম ও মিলন হয়। পরমা সুন্দরী পদ্মাবতীকে পাওয়ার আশায় সুলতান আলাউদ্দিন চিতোর আক্রমণ করে রত্নসেনকে পরাজিত ও হত্যা করে। এ শোকে পদ্মাবতী অগ্নিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দিয়ে সহমরণ গ্রহণ করে। এই কাহিনিটি এ কাব্যের মূল উপজীব্য। এই কাব্যের বিখ্যাত পঙক্তি—
‘তাঞ্জুল রাতুল হৈল অধর পরশে।’ সৈয়দ আলাওল
