লোকসাহিত্য
লোকসাহিত্য বলতে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত উপকথা, কাহিনি, গান, প্রবাদ, ছড়া প্রভৃতিকে বোঝায়। তবে আধুনিক যুগে লোকসাহিত্য লিখে রাখার প্রয়াস দেখা যায়। সাধারণত লোকসাহিত্য কোনো একক ব্যক্তির রচনা নয়, তা একটি সমাজের সামষ্টিক সৃষ্টি। লোকসাহিত্য এক-একটি অঞ্চলের জীবনধারার প্রতিফলন লক্ষণীয়। লোকসাহিত্য বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়ের শ্রেণিকরণ নানা শ্রেণিবিভাগ হতে পারে। তাই লোকসাহিত্যের বৈচিত্র্যপূর্ণ নিদর্শন বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় শ্রেণিবিভক্ত।
লোকসাহিত্যের শাখাগুলোর মধ্যে গীতিকা, উপকথা, রূপকথা, লোকগান, প্রবাদ, ধাঁধা, ছড়া প্রভৃতি। আখ্যানমূলক লোকগীতি সাহিত্যে গীতিকা নামে পরিচিত। নাথগীতিকা, ময়মনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা এর অন্তর্ভুক্ত।
লোকসাহিত্যের বিষয়বস্তু ও উপাদান
লোকসাহিত্যের বিষয়বস্তু বৈচিত্র্যময়। মানবজীবনের নানা উৎস লোকসাহিত্যের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ইতিহাস ও সমাজচিত্র, অতীত সমাজের চিন্তাভাবনা, জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও ধ্যান-ধারণা সাধারণ মানুষের কথাকাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় লোকসাহিত্যের বিষয়বস্তুতে স্থান পায়।
লোকসাহিত্যের বিচিত্র বিষয়বস্তুর ন্যায় উপাদানগুলোও বিচিত্র মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যেমন- জনশ্রুতিমূলক বিষয়াবলি, গান, কথা, গীতিকা, গাথা, প্রবাদ, ছড়া, ধাঁধা ইত্যাদি। লোকসাহিত্য হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় এমন নয়। সময়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কোনো ঘটনা বা কাহিনি লোকসমাজে চালু হয় এবং তা লোকসাহিত্যের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়।
ময়মনসিংহ গীতিকা
ব্রহ্মপুত্র নদীর দ্বারা দ্বিধাবিভক্ত বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার পূর্বাংশ নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জের বিল-হাওড় ও নদ-নদী প্লাবিত বিস্তৃত ভাটি অঞ্চলের লোককবি কর্তৃক রচিত আখ্যানমূলক কাহিনিকাব্যকে ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ বলা হয়। ড. দীনেশচন্দ্র সেন এগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। এর দুটি পালা : মহুয়া, মলুয়া।
চন্দ্রকুমার দে এবং দীনেশচন্দ্র
জাতীয় সংস্কৃতির যেকোন সাহিত্যগুণসম্পন্ন সৃষ্টি প্রধানত মৌখিক ধারা অনুসরণ করে অগ্রসর হয় তাকে লোকসাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম সৃষ্টি ছড়া। আদিমকাল থেকে এসব ছড়া
মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে। চন্দ্রকুমার দে এমন শাখা (ছড়া, গান, কথা, গীতিকা, ধাঁধা, গাথা কাহিনি, প্রবাদ) সংগ্রহ করে ১৯১৩ সালে প্রকাশ করেন। দীনেশচন্দ্র সেন এগুলো পরে সংগ্রহ করে চন্দ্রকুমারের সাথে সংগ্রহ করেন। রবীন্দ্রভবনে এগুলো সম্পাদনা করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশ করেন। দীনেশচন্দ্র সেন নিজেও কিছু গীতিকা সংগ্রহ করে ১৯২৬ সালে পূর্ববঙ্গ গীতিকা নামে প্রকাশ করেন। এভাবে চন্দ্রকুমার দে এবং দীনেশচন্দ্র সেন বাংলার প্রাচীন লোকসাহিত্যের উপাদান সংগ্রহ করে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে গেছেন তাই লোকসাহিত্যপ্রেমীর হৃদয়ে এমন নাম চিরদিনই জেগে থাকবে।
ছড়া
লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন ছড়া। ছড়ার বিষয়বস্তু অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। শিশু-জীবনের বিভিন্ন পর্যায় অবলম্বনে ছড়া রচিত হয় যেমন— ছেলেভুলানো ছড়া, খেলাধুলার ছড়া, নানা ধরনের ছড়িয়েছে ছড়া। বিষয়, প্রকৃতি, ব্যবসায় জীবন, উৎসব, নীতি, কৃষি, ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়বস্তুর অন্তর্গত ছড়া রচিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ একটি ছড়া উল্লেখ করা যায়—
ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি মোদের বাড়ি এসো,
বাটা ভরা পান দেবে গাল ভরে খেও।
মাছ কাটালে গন্ধ দেবে কেমন মেঘে লেও।
শীতল পানি পেতে হবে ঘুম এসো।
লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম সৃষ্টি হলো ছড়া এবং ধাঁধা।
উপকথা ও রূপকথা
পশু-পাখির চরিত্র অবলম্বনে যেসব কাহিনি গড়ে ওঠে সাধারণত সেগুলোকেই উপকথা বলা হয়। কৌতুক সৃষ্টি ও নীতি প্রচারের জন্যই এগুলোর সৃষ্টি। এতে মানবচরিত্রের মতোই পশু-পাখির বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে বস্তু পরিবর্তিত হয়। পঞ্চতন্ত্রে, নানা অবতার ও অবিশ্বাস্য ঘটনা রূপকথার উপজীব্য। বাস্তবতার সাথে রূপকথার সম্পর্ক নেই। রূপকথায় অজানা, অচেনা, রহস্যময় ঘটনার অবতারণা করা হয়। রূপকথায় আদিম ঘটনা দেশকাল, সমাজ, ধর্ম, নীতি, সৌন্দর্যবোধ ইত্যাদি উঠে।
লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম উপাদান ছড়া
ছড়া বাংলা লোকসাহিত্যের একটি বিশেষ ধারার নাম। প্রাচীন লোকসাহিত্যের অন্তর্গত ছড়া, গান ও বিদ্যা রয়েছে। সেগুলো তখনকার তা সাহিত্য বা ভাব প্রকাশের একটি আধুনিক রূপ। এটি সমষ্টিগত ব্যক্তি কিংবা সমাজের সচেতন মনের সৃষ্টি নয়— বরং স্বপ্নময় মনের অনায়াস সৃষ্টি। ছড়ার সংজ্ঞা নির্ণয় করা কঠিন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—
“ছড়ার একটি স্বতন্ত্র রাজ্য আছে, সেখানে
কোন আইন কানুন নেই— সে-মহাদেশের মতো।”
তবে সাধারণভাবে বলা যায় যে, যা মৌখিক আবৃত্তি করা হয় তাই ছড়া। রবীন্দ্রনাথ লোকছড়ার কতকগুলো বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছেন। যেমন—
১। ছড়ার ঘটনার ধারাবাহিকতা বা আনুপূর্বিক বর্ণনা থাকে না।
২। ছড়া ধ্বনিপ্রধান, সুরপ্রধান।
৩। ছড়ার রস ও চিন্তা আছে, কিন্তু তত্ত্ব ও উপদেশ নেই।
৪। ছড়ার ছন্দ স্বাধীন প্রধান, প্রকৃত বাংলা ছন্দ।
৫। ছড়া বাঙালিবর্জিত, দুর্বোধ্য ও সংক্ষিপ্ত।
রূপকথা ও লোককথা
রূপকথা : লোককথার অন্যতম একটি প্রধান শ্রেণি রূপকথা। অলৌকিকতাকে কেন্দ্র করে রূপকথার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে অলৌকিক ঘটনা ঘটে এবং কাহিনিগুলো দ্রুত সংক্ষেপিত হয়। আর রূপকথার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর যাদু মন্ত্র ও অলৌকিকতা। এসব উপাদানের প্রভাবে গল্পগুলো একের পর এক সংঘটিত হয়, সমস্যার সৃষ্টি হয়, সমস্যার সমাধানের জন্য একের পর এক নতুন নতুন চরিত্রের উদ্ভব হয় এবং সর্বশেষে সুন্দর সমাধান হয়ে তা মিলনাত্মক হয়। ঠাকুরমার ঝুলি’ তেমনি একটি রূপকথা।
লোককথা : যে লোকসাহিত্যের মধ্যে কাহিনি আছে, যা মুখগত বর্ণনামূলক, যার মধ্যে লোকিক ও অলৌকিক ঘটনা পাশাপাশি বিদ্যমান। আকাশ, মাটি, চন্দ্র
সূর্য, স্বর্গ-নরক, জল-স্থল, মহাগগন, পাতাল এক সহজ বৈকণ্ঠে আবদ্ধ, দুঃখের ও সুখের ব্যবধান যেখানে সহজেই অতিরিক্ত ঘটায়; যে কাহিনিতে মানুষ, পশুপাখি, কীটপতঙ্গের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়; খল চরিত্রের প্রভাব, নায়ক চরিত্রের উথান-পতন, নায়কের সহায়কারী শক্তির ভূমিকা ইত্যাদি উপস্থিত থাকে, সেগুলোই লোককথা। লোককথা একটি প্রধান শ্রেণি রূপকথা।
ময়মনসিংহ গীতিকার সম্পাদক ও সংগ্রাহক
— ময়মনসিংহ গীতিকার (১৯২৩) সম্পাদক দীনেশচন্দ্র সেন। আর এর সংগ্রাহক হলেন ‘চন্দ্রকুমার দে’। গীতিকাগুলোর নাম—
১. মহুয়া
২. মলুয়া
৩. চন্দ্রাবতী
৪. কমলা
৫. দেওয়ান ভাবনা
৬. দস্যু কেনারামের পালা
৭. রূপবতী
৮. কঙ্ক ও লীলা
৯. কাজলরেখা
১০. দেওয়ান মদিনা
মোট গীতিকা ১০টি।
মহুয়া ও দেওয়ান মদিনার চরিত্র
— মহুয়া : দ্বিজ কানাই প্রণীত ‘মহুয়া’ পালার চরিত্রগুলো হলো—
১. হুমরা
২. মানিক
৩. মহুয়া
৪. নদের চাঁদ
৫. পালং
৬. সন্যাসী
৭. সওদাগার
দেওয়ান মদিনা : মনসুর ব্যাতি প্রণীত দেওয়ান মদিনার চরিত্রগুলো হলো—
১. সোনাফর দেওয়ান
২. আলাল
৩. দুলাল
৪. মদিনা
৫. সেকেন্দার
৬. সুরবজ
৭. মনিনা
৮. আমিনা
— লোকসাহিত্যের একটি বিশেষ শাখা গান বা লোকগীতি। লোকগীতি এক একটি বিষয় অবলম্বনে গীত হওয়ার উদ্দেশ্যে কোন অজানা লোককবি কর্তৃক রচিত এবং তা লোকসমাজে মুখে মুখে গীত হয়ে চলে এসেছে। অন্যান্য লোকসাহিত্যের তুলনায় জনপ্রিয়তার দিক থেকে লোকগীতি বেশ প্রতিষ্ঠিত। লোকগীতিতে কোনো কাহিনি থাকে না। বিশেষ বিশেষ ভাব অবলম্বনে এই শ্রেণির গান রচিত। অঞ্চলভেদে লোকগীতির পার্থক্য দেখা যায়। যেমন- পশ্চিমবঙ্গের পটুয়া, ভাটু, ঝুমুর। উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া, পূর্ববঙ্গের জারি, ঘাটু ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বিষয়বস্তুর বিচিত্রতায়ও লোকগীতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। যেমন- পটুয়া সংগীতের বিষয়বস্তু হচ্ছে কৃষ্ণলীলা, রামায়ণ ও মনসামঙ্গল, ভাটুর বিষয়-প্রকৃতি-বন্দনা, ভাওয়াইয়ার বিষয়বস্তু প্রেম, সারি, ঘাটু প্রভৃতি।
— ময়মনসিংহ গীতিকা বাংলা লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্যোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যেসব গীতিকা সংগৃহীত হয়েছিল তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ নামে চার খণ্ডে প্রকাশিত হয়। ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিভক্ত সাবেক বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার পূর্বদিকে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জের বিল, হাওর ও বিভিন্ন নদনদী প্লাবিত বিস্তৃত ভাটি অঞ্চল বাংলার শ্রেষ্ঠ গীতিকার যে খ্যাতি লাভে বিখ্যাত হয়েছিল তাই ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ নামে দেশবিদেশের মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ বলতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ যেমন কোচ, গারো, হাজং, রাজবংশী প্রভৃতি মঙ্গোলীয় উপজাতি দ্বারা গঠিত। ময়মনসিংহ গীতিকার নারী চরিত্রগুলোতে সমাজে বঞ্চিত নারীর হারানো প্রেমের যে স্বীকৃতি রয়েছে তার রূপায়ণ ঘটেছে। ‘ময়মনসিংহ গীতিকার’ বিখ্যাত গীতিকাগুলো হলো মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী, কমলা, দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারামের পালা, কাজলরেখা ও দেওয়ান মদিনা ইত্যাদি।
