loader image

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ক্ষমতা, কাজ

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ক্ষমতা, কাজ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধান হলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(২) অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান (As Head of State) এবং রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করেন। প্রজাতন্ত্রের তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি তাঁর পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে প্রজাতন্ত্রের কোনো আদালত তাঁর বিরুদ্ধে কার্যধারা গ্রহণ করতে পারে না। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি হওয়ার কারণে তিনি একটি বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা ভোগ করেন।


রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নিয়ম ও আইনগত ভিত্তি

রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন বিষয়ে মূল সংবিধানে, অর্থাৎ ১৯৭২ সালের সংবিধানে দ্বিতীয় তফসিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নিয়ম বর্ণিত ছিল। দ্বিতীয় তফসিলের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যগণ কর্তৃক গোপন ব্যালটে নির্বাচিত হবেন—এটাই ছিল মূল নিয়ম। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ক্ষমতা, কাজ

পরবর্তীতে দ্বাদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৪৮(১)-এ নতুন বিধান যুক্ত করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বিধান করা হয় যে, রাষ্ট্রপতি আইনানুযায়ী সংসদ সদস্য কর্তৃক নির্বাচিত হবেন। এই সাংবিধানিক বিধানের আলোকে জাতীয় সংসদ ১৯৯১ সালের ১৪ই আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন পাস করে। এই আইনে বিধান করা হয় যে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের দ্বারা প্রকাশ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে থাকবেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি পরবর্তী ৫ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থাৎ একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারিত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ক্ষমতা, কাজ


মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলির উৎস

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলির উৎস প্রধানত দুইটি—
(১) প্রজাতন্ত্রের সংবিধান এবং (২) সাধারণ আইন

সংবিধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলিকে মোটামুটি ৫ ভাগে আলোচনা করা যায়। তবে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অনুচ্ছেদ ৫৬(৩) অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী এবং অনুচ্ছেদ ৯৫(১) অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা রাখেন। অন্যদিকে, বাকি সকল কাজে তিনি সাধারণত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করেন।


(ক) নির্বাহী বা শাসন সংক্রান্ত ক্ষমতা (Executive Power)

মহামান্য রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারের যাবতীয় নির্বাহী কার্যাদি রাষ্ট্রপতির নামে সম্পাদিত হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা ও কার্যসমূহ নিম্নরূপ—

(i) প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ

প্রজাতন্ত্রের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৬(৩) অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবেন। আবার অনুচ্ছেদ ৫৬(২) অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগ প্রদান করবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ক্ষমতা, কাজ

(ii) প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারক নিয়োগ

মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৫(১) অনুযায়ী মাননীয় প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রদান করেন। একই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির পরামর্শে অন্যান্য বিচারপতিও নিয়োগ প্রদান করেন।

(iii) অন্যান্য পদের নিয়োগ

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৬৪ অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল, অনুচ্ছেদ-১১৮ অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার, অনুচ্ছেদ-১২৭ অনুযায়ী মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং অনুচ্ছেদ-১৩৮ অনুযায়ী বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্য নিয়োগ প্রদান করেন।

(iv) বিধি প্রণয়ন

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৫(৬) অনুযায়ী সরকারি কার্যাবলি বণ্টন ও পরিচালনার জন্য বিধি প্রণয়ন করবেন। বর্তমানে এটি “Rules of Business-1996” বা “কার্য বিধিমালা-১৯৯৬” নামে পরিচিত।


(খ) আইন সংক্রান্ত ক্ষমতা (Legislative Power)

মহামান্য রাষ্ট্রপতির আইন সংক্রান্ত ক্ষমতা নিম্নরূপ—

(i) সংসদ অধিবেশন আহ্বান, স্থগিত ও ভেঙ্গে দেওয়া

সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৭২ অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভেঙ্গে দিতে পারেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ক্ষমতা, কাজ

(ii) ভাষণ ও বাণী প্রদান

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৩(১) অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদে ভাষণ দান ও বাণী প্রদান করেন। তিনি প্রতি বছরের প্রথম অধিবেশনে এবং সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশনে সংসদে ভাষণ প্রদান করেন।

(iii) বিলের সম্মতি

মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি ছাড়া কোনো বিল আইনে পরিণত হয় না। তিনি সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৮০ অনুযায়ী সংসদের গৃহীত বিলে সম্মতি প্রদান করেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ক্ষমতা, কাজ

(iv) অধ্যাদেশ জারি

সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৯৩ অনুযায়ী কতকগুলো শর্তসাপেক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।


(গ) অর্থসংক্রান্ত ক্ষমতা (Financial Power)

রাষ্ট্রপতির অর্থসংক্রান্ত ক্ষমতা নিম্নরূপ—

  1. সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৮২ অনুযায়ী কোনো বিল ‘অর্থ’ অথবা ‘সরকারি অর্থ’ ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত আছে এমন বিল রাষ্ট্রপতির সুপারিশ নিয়ে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করতে হবে।
  2. সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৮৯(৩) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সুপারিশ ব্যতীত কোনো মঞ্জুরি দাবি করা যাবে না।
  3. সংসদে কোনো মঞ্জুরি প্রত্যাখ্যান হলে সংবিধানের ৯২(৩) অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিশেষ আদেশ বলে অনূর্ধ্ব ৬০ দিনের জন্য সংযুক্ত তহসিল থেকে ব্যয়ের অনুমোদন দিতে পারবেন।

(ঘ) বিচারসংক্রান্ত ক্ষমতা (Judicial Power)

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৪৯ অনুযায়ী কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যে কোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বনা ও বিরাম মঞ্জুর করার এবং যেকোনো দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার ক্ষমতা মহামান্য রাষ্ট্রপতির আছে। রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতাকে “Pardoning Power” বলা হয়।


(ঙ) বিবিধ ক্ষমতা (Miscellaneous Power)

সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১৪৮-এর আলোকে সংবিধানের তৃতীয় তফসিল অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতির শপথ বাক্য পাঠ করান। রাষ্ট্রপতির এই সাংবিধানিক ক্ষমতা অনুচ্ছেদ ৪৮(৬) অনুযায়ী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সম্পন্ন হয়ে থাকে।


(২) সাধারণ আইন অনুযায়ী ক্ষমতা

সংবিধানের বাইরেও দেশে প্রচলিত সাধারণ আইন মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা প্রদান করেছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত আইনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হবেন এবং তিনি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দিবেন। তবে মহামান্য রাষ্ট্রপতির এ সকল ক্ষমতা সংসদের উপর নির্ভরশীল।


উপসংহার

প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠ ব্যক্তির সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তাঁর সকল কাজকর্ম তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করে থাকেন। তবে সংবিধান প্রদত্ত মর্যাদা ও দায়িত্বের আলোকে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top