বাংলার প্রাচীন শাসনামল
গঙ্গারিডাই
আলেকজান্ডার খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ সালে ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণকালে বাংলায় ‘গঙ্গারিডাই’ নামে এক শক্তিশালী ও সমৃদ্ধিশালী রাজ্য ছিল। পন্ডিতদের ধারণা, গঙ্গা নদীর যে দুইটি ধারা এখন ভাগীরথী ও পদ্মা নামে পরিচিত, এর মধ্যবর্তী অঞ্চলে গঙ্গারিডাই জাতির লোক বাস করত। এদের রাজা খুব পরাক্রমশালী ছিল। এ রাজ্যের রাজধানী ছিল ‘বঙ্গ’ নামে একটি বন্দর নগর। এখান থেকে সূ² সুতি কাপড় পশ্চিমা দেশসমূহে রপ্তানি হতো। গ্রিক ঐতিহাসিক ডিওভোরাস গঙ্গাডোরাস ‘গঙ্গারিডাই’ রাজ্যকে দক্ষিণ এশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে সমৃদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। অনেকে মনে করেন যে, ‘গঙ্গারিডাই’ রাজ্যটি আসলে বঙ্গ রাজ্যই ছিল, ‘গঙ্গারিডাই’ ছিল শুধু এর নামান্তর।
মৌর্য যুগ
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সাম্রাজ্যের নাম মৌর্য সাম্রাজ্য। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য খ্রিস্টপূর্ব ৩২১ অব্দে মগধের সিংহাসনে আরোহনের মাধ্যমে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র পালিবোথরা।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (৩২৪-৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)
আলেকজান্ডারের ভারতবর্ষ ত্যাগের পর গ্রিক সেনাপতি সেলিউকাসকে পরাজিত করে চন্দ্রগুপ্ত বিশাল সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র। চাণক্য ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও বিন্দুসারের উপদেষ্টা। চাণক্যের ছদ্মনাম কৌটিল্য। রাষ্ট্রশাসন ও ক‚টনীতি কৌশলের সারসংক্ষেপ ছিল তার রচিত অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটি। চন্দ্রগুপ্তের সময়ে গ্রিক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিস ভারতবর্ষে আগমন করে ভারতের শাসন ব্যবস্থা, ভৌগোলিক বিবরণ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইন্ডিকা’তে লিপিবদ্ধ
করেন। এই ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থ বর্তমানে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে পরিগণিত।
সম্রাট অশোক
সম্রাট অশোক ছিলেন প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। কথিত আছে যে, মৌর্য বংশের এই সম্রাট তাঁর ৯৯ জন ভ্রাতাদের মধ্যে অধিকাংশকে পরাজিত করে এবং কোন কোন ভ্রাতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন। এজন্য তাকে ‘চন্ডাশোক’ বলা হয়। তাঁর শাসনামলে প্রাচীন পুÐ্র রাজ্যের স্বাধীন সত্ত্বা বিলোপ হয়। মৌর্য সাম্রাজ্য বাংলায় উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। সম্রাট অশোক সিংহাসনে আরোহণের অষ্টম বছরে কলিঙ্গ যুদ্ধে জয়ী হন। এ যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ লোক নিহত হয়। যুদ্ধের বিভীষিকা ও রক্তপাত দেখে
তিনি অহিংস বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি ব্রাহ্মীলিপির পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং এ লিপিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেন। আমাদের বাংলা লিপির উৎপত্তি ব্রাহ্মীলিপি থেকে। শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথ।
গুপ্ত যুগ
গুপ্তযুগকে প্রাচীন ভারতের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এ যুগে সাহিত্য, বিজ্ঞান, ও শিল্পের খুবই উন্নতি হয়। গুপ্তবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শ্রীগুপ্ত। কিন্তু তিনি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নি। ১ম চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। গুপ্ত আমলেও বাংলার রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র।
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩৪০ খ্রি.)
শ্রীগুপ্তের পৌত্র চন্দ্রগুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম রাজা। তিনি ৩২০সালে মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র। তিনি মগধ হতে এলাহাবাদ পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন।
সমুদ্রগুপ্ত (৩৪০-৩৮০ খ্রি.)
সমুদ্রগুপ্ত ছিলেন বিচক্ষণ কূটনীতিবিদ ও কুশলী যোদ্ধা । সমগ্র পাক-ভারতকে একরাষ্ট্রে পরিণত করার তীব্র আকাক্সক্ষা এবং এ লক্ষ্যে রাজ্যজয়ের কারণে তাকে ‘প্রাচীন ভারতের নেপোলিয়ন’ আখ্যা দেয়া হয়। তিনি ছিলেন গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। তার আমলে সমতট ছাড়া বাংলার অন্যান্য জনপদ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১৫ খ্রি.)
তিনি উপমহাদেশ থেকে শুক শাসন বিলোপ করেন। মহাকবি কালিদাস ছিলেন তাঁর সভাকবি। তিনি ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং ‘বিক্রমাব্দ’ নামক সাল গণনা প্রবর্তন করেন। তাঁর সময়ে গুপ্ত সাম্রাজ্য উন্নতির শিখরে পৌঁছে। তাঁর সামরিক শক্তির সাফল্য তাঁকে ইতিহাসে অমরত্ব দান করেছে। হুনদের আক্রমণ প্রতিহত করে সাম্রাজ্যের অখন্ডতা রক্ষা করেন। তিনি ছিলেন গুপ্ত বংশের সর্বশেষ শক্তিশালী নরপতি। তাঁর আমলে চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন ভারতবর্ষে আগমন করেন। ১০ বছর ভারতে থাকাকালে তিনি ৭টি গ্রন্থ রচনা
করেন। এর মাঝে ‘ফো-কুয়ো-কিং’ উল্লেখযোগ্য। অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তি তার দরবারে ছিলেন। যেমন কালিদাস, বিশাখা দত্ত, আর্যদেব, সিদ্ধসেন, দিবাকর প্রমূখ। আর্যভট্ট ও বরাহমিহির ছিলেন সেই সময়ের বিখ্যাত বিজ্ঞানী। সবার আগে পৃথিবীর আহ্নিক ও বার্ষিক গতি নির্ণয় করেছিলেন আর্যভট্ট। ‘আর্য সিদ্ধান্ত’ তার গ্রন্থের নাম। বরাহমিহির ছিলেন
জ্যোতির্বিদ। তার গ্রন্থের নাম ‘বৃহৎ সংহিতা’।
বুধগুপ্ত (৪৬৭-৪৯৬)
গুপ্ত বংশের শেষ শাসক ছিলেন বুধগুপ্ত (৪৬৭-৪৯৬)। তিনি ছিলেন দুর্বল শাসক এবং তাঁর সময়ে ৬ষ্ঠ শতকের প্রথম দিকে মধ্য এশিয়ার যাযাবর হুন জাতির আক্রমণে ভেঙ্গে যায় গুপ্ত সাম্রাজ্য।
