মুঘল শাসনামল
মুঘল শাসনামল
মোঙ্গল জাতির আদি বাসভূমি ছিল মঙ্গোলিয়া। মঙ্গোলিয়া থেকে এসে মধ্য এশিয়ার পশ্চিম অঞ্চলে বসবাস করার সময় থেকে তারা মুঘল নামে অভিহিত হয়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে বাবর ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য স্থাপনে উদ্যোগী হলে আফগানদের সাথে মুঘলদের তীব্র প্রতিদ্বন্দিতার সূত্রপাত হয়। বাবরের পুত্র হুমায়ুনের আমলে ভারতে নব-প্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
জহির উদ্দিন মুহম্মদ বাবর (১৫২৬-১৫৩০)
জহির উদ্দিন মুহম্মদ সাহসিকতা ও নির্ভীকতার জন্য ইতিহাসে ‘বাবর’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। তিনি পিতার দিক হতে তৈমুর লঙ এবং মায়ের দিক থেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন। তিনি হলেন মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ১৫২৬ সালে পানি পথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে তিনি মুঘল সা¤্রাজ্য স্থাপন করেন। ‘তুযক-ই-বাবর’ বা বাবরের আত্মজীবনী নামক গ্রন্থে বাবর তাঁর জীবনের জয় পরাজয়ের ইতিহাস অতি সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেন। এটি ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা নগরীতে অবস্থিত ছিল। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উগ্রবাদী হিন্দুগোষ্ঠী ঐতিহাসিক এই মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলে।
▪ মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা- সম্রাট বাবর (১৫২৬ সালে)।
▪ সম্রাট বাবরের জন্ম বর্তমান রুশ- তুর্কিস্থানের অন্তর্গত ফারগানায়।
▪ বাবর শব্দের অর্থ- বাঘ।
▪ সম্রাট বাবর পিতার দিক থেকে-তৈমুর লঙ এবং মায়ের দিক থেকে- চেঙ্গিস খানের বংশধর।
▪ পানিপথের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়- ১৫২৬ সালে বাবর ও ইব্রাহীম লোদীর মধ্যে।
▪ ১৫২৬ সালে ইব্রাহীম লোদীর সাথে সংঘটিত পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে সূত্রপাত হয়- মুঘল সাম্রাজ্যের।
▪ পানিপথের অবস্থান- দিল্লির অদূরে অর্থাৎ ভারতের উত্তর প্রদেশের হরিয়ানা নামক স্থানে (দিল্লি ও আগ্রার মধ্যবর্তী যমুনা নদীর তীরে)।
▪ সম্রাট বাবর রচিত আত্মজীবনীর নাম- তুযক-ই-বাবর বা বাবরনামা, এটি তুর্কি ভাষায় রচিত।
▪ সম্রাট বাবর মৃত্যুবরণ করেন- ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ডিসেম্বর (সমাহিত করা হয় আফগানিস্তানের কাবুলে)।
নাসির উদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ুন (১৫৩০-১৫৪০ এবং ১৫৫৫-১৫৫৬)
বাবরের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হুমায়ুন দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট হুমায়ুন বাংলায় প্রবেশ করেন এবং গৌড় অধিকার করেন। তিনি গৌড় নগরের অপরূপ সৌন্দর্য এবং এর অপরূপ জলবায়ুর উৎকর্ষ দেখে মুগ্ধ হন। তিনি গৌড় নগরীর নাম পরিবর্তন করে ‘জান্নাতাবাদ’ রাখেন। ১৫৩৯ সালে চৌসারের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে হুমায়ুন কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে দিল্লি পৌছেন। পরের বছর (১৫৪০ সাল) শের শাহের বিরুদ্ধে আবার অভিযান পরিচালনা করেন। বিজয়ী শের শাহ দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। শের শাহ ভারতে পাঠান শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। পারস্য সম্রাটের সহায়তায় হুমায়ুন ১৫৫৫ সালে পুনরায় দিল্লি দখল করেন।
১৫৫৬ সালে দিল্লির অদূরে তাঁর নির্মিত দীন পানাহ দুর্গের পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
▪ সম্রাট হুমায়ুন ক্ষমতা লাভ করেন- ৩০ ডিসেম্বর ১৫৩০ এবং সিংহাসনচ্যুত হন- ১৭ মে ১৫৪০।
▪ বক্সারের নিকটবর্তী চৌসার নামক স্থানে শের শাহ হুমায়ুনকে অতর্কিত আক্রমণ করেন- ১৫৩৯ সালে।
▪ চৌসারের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে হুমায়ুন কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে- দিল্লি পৌঁছেন।
▪ সম্রাট হুমায়ুন ১৫৪০ সালে শের শাহের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে পরাজিত হন- কনৌজের যুদ্ধে।
▪ পারস্য সম্রাটের সহায়তায় হুমায়ুন পুনরায় দিল্লি দখল করেন- ১৫৫৫ সালে।
▪ বাংলাকে জান্নাতাবাদে বলে আখ্যায়িত করেন- ১৫৩৮ সালে।
▪ বাংলাকে জান্নাতাবাদ বলে আখ্যায়িত করেন- সম্রাট হুমায়ূন।
▪ ১৫৫৬ সালে দিল্লির অদূরে তাঁর নির্মিত দীন পানাহ দুর্গের পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন- সম্রাট হুমায়ুন।
জালাল উদ্দিন মুহম্মদ আকবর (১৫৫৬-১৬০৫)
১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মাত্র ১৩ বছর বয়সে আকবর দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর বৈরাম খান আকবরের রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত হন। এজন্য আকবর অনুরাগবশত তাকে খান-ই-বাবা (LordFather) বলে ডাকতেন। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর হিমু দিল্লির মুঘল
শাসনকর্তাকে পরাজিত করে দিল্লি ও আগ্রা অধিকার করেন এবং স্বাধীনভাবে রাজত্ব শুরু করেন। ১৫৫৬ সালে পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে আকবর হিমুকে পরাজিত করেন। এ যুদ্ধের ফলে আকবর দিল্লি অধিকার করেন। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে মুঘল সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তার লাভ করে। আকবর ১৫৭৬ সালে বাংলা জয় করেন। অমুসলমানদের উপর ধার্য সামরিক করকে জিজিয়া কর বলে। সম্রাট আকবর রাজপুত ও হিন্দুদের বন্ধুত্ব অর্জন করার
জন্য তীর্থ ও জিজিয়া কর রহিত করেন। তিনি রাজপুত কন্যা যোধাবাঈকে বিবাহ করেন। তিনি রাজপুতদের বিভিন্ন উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করেন। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে সকল ধর্মের সার সম্বলিত ‘দীন-ই-ইলাহী’ নামক নতুন একেশ্বরবাদী ধর্মমত প্রবর্তন করেন। সম্রাট আকবর মনসবদারী প্রথা চালু করেন। সম্রাটের রাজসভার সদস্যদের মধ্য আবুল ফজল ফেজী, টোডরমল, বীরবল, মানসিংহ প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল রাজস্ব ক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। টোডরমল এদেশের সরকারি কাজে ফারসি ভাষা চালু করেন। ফারসির অনুকরণে এদেশে গজল ও সুফি সাহিত্যের সৃষ্টি হয়। আকবরের সভাসদ আবুল ফজল তাঁর বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরী’ নামক গ্রন্থে দেশবাচক বাংলা শব্দ ব্যবহার করেন। তিনি ‘বাংলা’ নামের উৎপত্তি সম্পর্কে দেখিয়েছেন যে, এদেশের প্রাচীন নাম ‘বঙ্গ’ এর সাথে বাধ বা জমির সীমানাসূচক ‘আল’ (-আলি, আইল) প্রত্যয়যোগে ‘বাংলা’ শব্দ গঠিত হয়। আকবরের রাজসভার গায়ক ছিলেন
তানসেন। আকবরের রাজসভার বিখ্যাত কৌতুককার ছিলেন বীরবল। ১৬০৫ খ্রি. সম্রাট আকবর মৃত্যুবরণ করেন। আগ্রার সেকেন্দ্রায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ (Bengali Calendar):
ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে সকল কাজকর্ম হতো। মুঘল সম্রাট
আকবর প্রচলিত হিজরী চন্দ্র পঞ্জিকাকে সৌরপঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেন। সম্রাট আকবর ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চন্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। আমির ফতুল্লাহ শিরাজীর সুপারিশে সম্রাট আকবর ৯৯২ হিজরী (১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ)-এর বাংলা সৌর বর্ষপঞ্জির প্রবর্তন করেন। তবে তিনি ২৯ বছর পূর্বে তাঁর সিংহাসনে আরোহণের দিন থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী (১৫৫৬ খ্রি.) থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। গ্রেগোরিয়ান সনের মতো বাংলা সনেও মোট ১২টি মাস। বৈশাখ বঙ্গাব্দের প্রথম মাস এবং পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।
১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি কর্তৃক বাংলা সন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি বাংলা সন সংস্কার করে। বাংলা সনের ব্যাপ্তি গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জির মতোই ৩৬৫ দিনের।
